Saturday, 12 December 2020

পহেলী পাল -এর ✍️ আয় খুকু আয়

"কাটেনা সময় যখন আর কিছুতে..." বেজে উঠল কলিং বেলটা। সূর্যকান্তবাবুদের বাড়ির টিং টং কলিং বেলের ছুটি হয়ে গিয়েছে তা আজ প্রায় পাঁচ বছর হল। কাজের সূত্রে অনেক দিন বাড়ি থেকে দূরে থাকতেন বলেই হয়তো তাঁর আদুরে মেয়ে কিরণ বাবার ওপর একটু অভিমান প্রকাশ করা জন্য এই গানটা কলিং বেলে সেট করিয়ে এনেছিল। তবে ঘটনাটা উল্টেছে সাত দিন হলো। এখন এই বেলের অপেক্ষায় সূর্যকান্তবাবু নিজে। কিরণ সদ্যবিবাহিতা এবং আজ অষ্টমঙ্গলা। সক্কাল থেকে তাঁর ব্যস্ততাটা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। আজ কখন কীভাবে কী আয়োজন করবেন তা ভেবে কাল রাতে তো ঘুমোনই নি, উপরন্তু ভোরবেলা থেকে যা শুরু করেছেন তাতে পাড়া- প্রতিবেশীদেরও ঘুম ভেঙে যাবার উপক্রম। গান গাইতে গাইতে বাজার গিয়ে প্রায় পুরো বাজারটাই নিয়ে এলেন। ফিরে এসে নাচতে নাচতে রান্না শুরু করে দিলেন। স্ত্রী রমাদেবীর হাতের রান্না যতই চমৎকার হোক না কেন, আজ সাত-সাতটা দিন বাদে মেয়ে বাড়ি আসতে চলেছে; তাই রান্না আজ তিনিই করেছেন। লুচি, সাদা আলুর ঝাল, মটরশুঁটির ঘুগনি, মুড়িঘন্ট, গুড়ের পায়েস আরও কত কি। মেয়ের জন্যে এ ধরনের বাড়াবাড়ি তাঁর চিরকালের।
"আরে, সব তো মেয়ের পছন্দের খাবার। জামাই কী কী ভালোবাসে শুনতে পারতে তো।" না জানি সেই সকাল থেকে কতবার একথা বলেছেন রমাদেবী। আর ততবারই...
"আহা গিন্নি, চিন্তা করছো কেন, এসব খাবারও ভালোই লাগবে দেখো।" বলেছেন সূর্যকান্তবাবু। "না হয় এত বছর থেকেছে বিদেশে, তা বলে কি মুড়িঘন্টকে কেউ ভুলতে পারে। আর তাছাড়া অপূর্ব সত্যিই অপূর্ব। শিক্ষা, সাজ-পোশাক, সংস্কার সবেতেই। বুঝলে তো, ব্যবহার, এই ব্যবহারই হল মানুষের আসল পরিচয়। ওদের শিক্ষার মান ওদের কথাতেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
- সত্যি গো। এ যুগেও যে এমন মানুষ হয় ভাবতেই পারিনি। ছেলে বিলেত ফেরৎ, তাও একটা টাকা পণ নিলেন না ! ভাগ্যিস ওনাদের সম্বন্ধটা এসেছিল, নইলে তুমি যা গোঁ ধরে বসেছিলে আমার মেয়েটার বিয়েই হতো না। 'পণ দেবো না'। এটা কোনো কথা ? কেনো দেবে না ? ভগবান তো কোনো অভাব রাখেননি।
- আচ্ছা কেন দেবো পণ ? মেয়ে কি আমার বোঝা যে টাকা-পয়সা দিয়ে বিদেয় করবো ? 
- আর যদি এমন ছেলে না পেতে ? তবে ?
- সারাজীবন নিজের কাছে রেখে দিতাম। তবু কোনো ভুল লোকের হাতে দিতাম না।
- আমারই ভুল। ক্ষমা করুন। 

এই বলে বচসার ইতি টেনে পুজোর জোগাড় কতদূর হলো দেখতে গেলেন রমাদেবী। 

এদিকে রান্নাবান্নার পালা শেষ প্রায়। সূর্যকান্তবাবুর গলাতেও গুনগুন গুলো জোড়ালো হয়ে উঠেছে। "আয় খুকু আয়.... আয় খুকু আয়...." গানটা বাজলেই গলা ছেড়ে গাইতেন তিনি। আজও ব্যতিক্রম হয়নি। বরং আজ যেনো তাতে আবেগ দু'চামচ বেশিই আছে। 
"দরজাটা না খুললে তোমার খুকু আসবে কীভাবে ?" ঠাকুর ঘর থেকে রমাদেবীর চিৎকারে ঘোর কাটলো তাঁর। এ হে, তাইতো। আসলে মেয়ের আসার অপেক্ষায় গানটা গাইতে গাইতে কখন যে সে এসে তার স্মৃতির ঘন্টাটা বাজিয়ে দিয়েছে আর সুর ভেতরের অপেক্ষার ধ্বনির সাথে মিশে একটা মায়ামাখা মূহুর্ত তৈরী করে ফেলেছে, সেটা তিনি বুঝতে পারেননি এতক্ষণ। তাড়াতাড়ি করে হাতের কাজ ফেলে একপ্রকার দৌড়ে গেলেন দরজায়, ছিটকিনিতে হাত দিয়ে মনে হল একটা হাসির কিরণে এক্ষুণি সেরে উঠবে সাতদিন আঁধারে পোড়া বাড়িটা। 

দরজা খুলে গেল ভেতর থেকে। সূর্যকান্তবাবুর গানের রেশটা মিলিয়ে দিয়ে গেল ওপার থেকে আসা একরাশ শূন্যতা। "দুম করে ঘরে নিয়ে এসোনা কিন্তু । নিয়ম-রীতি বলে তো কিছু আছে না কি।" ঠাকুর ঘর থেকে বেড়িয়ে আসতে আসতে বললেন রমাদেবী। হাতে বরণডালা। " একি ! কোথা..." কথাটা শেষ করতে পারলেন না তিনি। তাঁর সামনে এখন চেনা পোশাকে দু'টো অচেনা মুখ। আর..... আর ! আর ওটা কী ? কিছুই বুঝতে পারছেন না তাঁরা। 
"সূর্যকান্ত সেন ?" ওপার থেকে একজন বলে উঠলেন। মনে অনেক প্রশ্ন নিয়ে মাথা নাড়লেন সূর্যকান্তবাবু। 
- কিরণ সাহা আপনার মেয়ে ?
রমাদেবীর বুকের ভেতরটা খচাৎ করে ওঠে। আবারও সম্মোহিতের মতো মাথা নাড়ান সূর্যকান্তবাবু।
"অপূর্ব সাহা..." নামটা কানে যাওয়া মাত্রই "আমার জামাই" বলে উঠলের রমাদেবী। "কোথায় সে ? আপনি এখানে কেনো ? আমার মেয়ে কোথায় ?" 
- সে এখন হাজতে। আর আপনার মেয়ে.... 

মাথা থেকে টুপিটা নামাতে নামাতে সরে দাঁড়ালেন ইনসপেক্টার। মাটিতে রাখা সাদা কাপড়টার ওপর থেকে চাদর সরালেন আর একজন। ভেসে উঠলো একটা মুখ যা সূর্যকান্তবাবু চোখে হারাতেন। 
"ছিঃ ! টাকার জন্য যে মানুষ আর কত নীচে নামবে ! কেউ ছাড়া পাবে না। আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন। এখন বধূহত্যার আইন ভীষণ কড়া... " কথাগুলো ধীরে ধীরে কেমন মিশে যেতে লাগলো। সময়টা যেন থেমে গেছে। এর মধ্যে কারোর একজনের হাত লেগে কলিং বেলটা গাইতে শুরু করেছে... "আয় খুকু আয়...." খুকু তো আর ছুটে আসতে পারছে না। তাই বাবাই এগিয়ে চলেছে তাঁর খুকুর দিকে।

No comments:

Post a Comment

মাসিক পত্র ৪ (এপ্রিল ২০২১)

Click here. এখানে ক্লিক করুন