আড়াইটে হতে পারে আবার একটা দেড়টাও।আমাদের কাছে হাতঘড়ি থাকলেও,এই ঘুটঘুটে অন্ধকারে কিছু বোঝা যাচ্ছে না।ভুল করে টর্চ লাইট ও সঙ্গে আনিনি। মোবাইল যুগের অনেক আগের কথা এটি।যখন যুবকদের রাত পরীতে ধরতো। ঝাড়ফুঁক করে ঘাড় থেকে ঐ পরী নামানো হতো।
কামরাঙাগুড়ি গ্রামে তখন কেন্টার সাহেবের কয়েক একর জায়গা নিয়ে বিরাট আনারস বাগান।আর ঐ বাগান ঘিরেই যাবতীয় রহস্য। ব্রিটিশরা চলে গেছে তাও পঁচিশ ত্রিশ বছর হবে। কিছু কিছু সাহেব কি কারণে যেন ভারতবর্ষে থেকে যায়।কেন্টার সাহেব ও তাই।হয়তো দেশে আর সম্পর্কের কেউ বেঁচে নেই বা অন্য কোনো কারণ। একটা দিগন্ত মেলানো বাগানের শেষটা ছিলো দূরের নদীর পাড় পর্যন্ত। মাঝখানে ছিলো একটা কাঠ কাঁচ টিনের চালার ছোটো একটা বাড়ি আর ঐ বাড়িতেই থাকতেন কেন্টার সাহেব একা একা। দিনের বেলায় কুলী কামিন নিয়ে বাগানের তদারকী করতেন। কখনো বেরিয়ে শহরে আসতেন। নিজের প্রয়োজনে। স্থানীয় কারো সাথেই কথা বলতেন না। কুলী কামীনরাও জানতেন না বাগানের বাইরে কোনো কথা।ঐ বাড়ি আর সাহেব ছিলেন তাই রহস্যময় সবার কাছে।
সেই রহস্যময়তা আমাদের ঐ তরুন বয়সে হাতছানি দিয়ে ডেকেছিলো। শুনতাম পরীরা রাত হলে পাহাড় থেকে উড়ে এসে ঐ বাগানে নামে।নিশি ডাকে আয় আয় করে বাগানে আর সবশেষের মস্ত আকর্ষণ বাগানে ভূত আছে।দু বন্ধু মিলে ঠিক করলাম ভূত দেখতে একদিন ঐ আনারস বাগানে যাবো।
সাইকেলটা শ্যামলের দোকানে জমা রেখে রাত নটা নাগাদ কেন্টার সাহেবের বাগানে ঢুকলাম। কৃষ্ণপক্ষের রাত,কি একটা তিথি বলতে পারবো না।শুনেই নিয়েছিলাম আগে, ভূত দেখতে হলে কৃষ্ণপক্ষের তিথিতে যেতে হবে। ঘুটঘুটে অন্ধকার।সারি সারি আনারসের মাঝে ফালি রাস্তা।এদিক ওদিক হলেই, কাঁটার খোঁচা খাচ্ছি। মাথা নিঁচু করে পাশ কাটিয়ে কাটিয়ে ধীরে ধীরে কেন্টার সাহেবের ঘরের কাছে এলাম।ঘর থেকে এক টুকরো আলো কাঁচের জানালা ভেদ করে ঘন অন্ধকারের বাগানে পড়ছিলো। কাঁচের জানালা দিয়ে উঁকি মেরে দেখি, স্তিমিত লম্বাটে চিমনির ডিম লাইটের ল্যাম্পে সাহেব বেতের চেয়ারে বসে কি এক বই পড়ছে, গভীর মনোযোগ দিয়ে।মেঝেতে অনেকগুলো বেড়াল বসে আছে চুপটি করে।সামনে বেতের টেবিলে লাল বোতল,গেলাস আর খাদ্যদ্রব্যাদী সাজানো।এই না হলে সাহেব!না আর কিছু নেই।সাহেব যেন টের না পায়,তাই আমরা সামনের কাঁঠাল গাছে আড়াল নিলাম।একটা সময় আলো নিভে গেলো।আনারস বাগান যেন প্রেতপুরীতে পরিণত হলো আরও ঘন গাঢ় কালো অন্ধকার নেমে আসাতে। বাগানের আনারস গাছগুলো এক একটা কালো মিশমিশে বাচ্চাভূত। সন্দীপ বললো,কি রে,পরীরা উপর থেকে নেমে এলে দেখতে পাবো তো?যদি আমাদের দেখে ফেলে?
আমি বললাম,ঐ সব ভেবে এখন কোনো লাভ নেই।
অন্ধকারে মনে হলো দূর থেকে কালো কালো একটা মানুষের আকৃতির কেউ যেন বাগানে এদিকে আসছে।দুই বন্ধু এ ওর হাত চেপে ধরে কাঁঠালের গুড়িতে ভালো করে লুকোবার চেষ্টা করলাম।পরীরা তো রাত আলো করে আসে,ওদের রানীর মতন বেশভূষা।তবে এ কে?ক্রমে বোঝা গেল একটা মানুষের মতন প্রানী।একটা কি উগ্র গন্ধ নাকে এসে লাগছে।ভূত নাকি!
খুট করে সাহেবের দরজা খোলার আওয়াজ হলো। সাহেবের নিঁচু স্বরের গলা---ঝিমলি,মাই পরী,এসসো---। ঝিমলি তাহলে পরীটার নাম। সাহেবের সখ্যতা তাহলে পরীদের সাথে?রাত বিরেতে ওদের নিয়ে থাকে?সবাই তাহলে তো ঠিকই বলে,বাগানে রাত হলে পাহাড় থেকে পরীরা এসে নামে।
এমন সময় ঘটলো একটা কান্ড, কাঁঠাল গাছথেকে হঠাৎ কি যেন বিকট শব্দ করে আমাদের সামনে পড়লো।আর ঐ শব্দে সন্দীপ ভয়ে আর্ত চীৎকার করে উঠলো।সাহেব ভেতর থেকে চেঁচিয়ে উঠলো,কৌন কৌন ডাককু ডাককু! আমরা প্রাণপনে চো চা দৌড় লাগালাম নদীর দিকে,ঐ দিক দিয়ে ভাগতে হবে আমাদের।
আনারসের কাঁটার খোঁচায় ক্ষতবিক্ষত হচ্ছি প্রতি মূহুর্তে।আকাশে এক সরু কুমড়োর ফালির মতন চাঁদ।পেছনে সাহেব আর ঐ দুষ্টু পরীর মিশ্রিত চেঁচামেচি অন্ধকার রাতের নিস্তব্ধতা খান খান করছিলো আর ধেয়ে আসছিলো আমাদের দিকে অজস্র ভয়ানক হিংস্র সব বেড়াল। বাঁ দিক,ডান দিক,সামনে, পেছনে সব জায়গায় মিউ মিউ মিউ মিউ।আমি ভারী কিছুতে বেঁধে প্রায় নদীর ধারে এসে উল্টে পড়ি,সন্দীপ তার আগেই উল্টে পড়েছিলো।মিউ মিউ মিউ মিউ!
ঞ্জান ফিরতেই দেখি হাসপাতালে সারা গায়ে হাতপায়ে ব্যান্ডেজ বেঁধে বেডে শুয়ে আছি।এদিক ওদিক তাকিয়ে মিউ মিউ খুঁজছিলাম।পাশের বেডে ভালোমতন লক্ষ করে দেখি সন্দীপ শুয়ে আছে, আমার মতন সাজসজ্জা করেই। হাতে পায়ে মাথায়।মুখে ম্লান হাসি।
ও মনে হয় এদিকে ওদিকে তাকিয়ে কিছু খুঁজছিলো,মিউ মিউ হবে বোধহয়।তারপর এই এতোটা বয়স হয়ে গেলেও,এখনো বেড়ালের আশপাশে ঘেঁসি না।
No comments:
Post a Comment